বাংলাদেশে উচ্চ থেকে নিম্নবিত্ত যে কোন ধাপেই, শিক্ষার হার যাই হোক না কেন, বলেন তো এমন একটা বিয়ে হতে শুনেছেন যেখানে, বিয়ের আগে ছেলে এবং মেয়েকে কতগুলো অত্যন্ত মূল্যবান বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তারপর বিয়েতে মত দেবার জন্য উৎসাহী করা হয়?

হ্যা, আলোচনা করতে দেয়া হয়, হয়তো কয়েক ঘন্টা কিংবা কয়েকদিন বা মাস। কিন্তু সেখানে বলে দেয়া হয় না, আসলে কোন বিষয়গুলো তাদের বোঝাপড়ার দাবিদার। আমরা সন্তানদের বলে দেই না, দাম্পত্য জীবন একটা আমৃত্যু যাত্রা…সেটা কখনোই “Happily Ever After” বাস্তবে না, সেটা কখনোই একচেটিয়া একজনার আরাম আয়েসের জন্য না, সেটা কখনোই তাদের জীবনে লালিত সবকটা স্বপ্ন পূরনের না, বরং দুজনার স্বপ্ন মিলে নতুন স্বপ্ন গড়ার জীবন, যে জীবনে দুজনারই কিছু স্বপ্ন পূরনের কিছু ছেড়ে দেবার….দাম্পত্য জীবন মানে চড়াই উৎরাই আর সেখানে টিকে থাকার মূল মন্ত্র একজন অন্যজনকে জানা, বোঝা। বিয়ে আমাদের এই উপমহাদেশে সাধারণত তিন ভাবে হয় ।

১. পরিবারের আলোচনা সাপেক্ষে;

২. ছেলে মেয়ের পছন্দ সাপেক্ষে, পরিবারের মত নিয়ে;

৩. পরিবার মানছে না, তাই পালিয়ে যেয়ে ।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই তিনের যে কোনো প্রথাতেই কয়েকটি মূল বিষয়ে আলোচনার যথেষ্ট সুযোগ থাকে, অথচ কি অবলীলায় সেই অবশ্য আলোচ্য বিষয়গুলো আমরা অন্যান্য আলোচনার ভীড়ে হারিয়ে ফেলি কিংবা এসব নিয়ে যে আলোচনা করতে হবে বা করা উচিত তাই জানি না। অথচ, আমি দিব্যি দিয়ে বলতে পারি গড়ে ৬০ ভাগ দাম্পত্য জীবন অসুখী হচ্ছে, সম্পর্কের শুরুতে সেই সব মূল আলোচনার অনুপস্থিতিতে ।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, আমরা কাকে একটা স্বার্থক বিয়ে বলবো? যে বিয়ে এভাবে সেভাবে যে কোন একভাবে টিকে গেছে তাকে? নাকি তাকে, যেখানে বছরের পর বছর গড়ালেও ভালোবাসা অটুট থাকে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকে তাকে? এভাবে সেভাবে টিকে যাওয়া বিয়ে কারোই কাম্য নয়, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, তাই হয়ে এসেছে এতকাল। মেনে নিয়েছে একপাশ থেকে সমাজ লোকলজ্জার মুখে, অথবা \”দাম্পত্য জীবন মানে তো এমনি\” এমনটা ভেবে। সাধারণত বিয়ের সময় পরিবারের পক্ষ থেকে খোঁজ নেয়া হয়, উভয় পক্ষের পারিবারিক পরিচিতি, আর্থিক স্বচ্ছলতা, ছেলে মেয়ের শিক্ষা (যদিও \”শিক্ষা\”বলতে ছেলে বা মেয়ের \”পাত্র\” বা \”পাত্রী\” হিসেবে যোগ্যতার মাপকাঠি ভিন্ন হয়।), ছেলের উপার্জন ক্ষমতা, মেয়ের সংসারী হবার ক্ষমতা….এইসব। এই সবই ঠিক আছে। এই সবই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু তার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ছেলে বা মেয়ে যাদের বিয়ে হচ্ছে তাদের মন মানসিকতার মিল আছে কিনা; দু’জনারই তো স্বপ্ন আছে, সেই স্বপ্নে একজন আরেকজনার সাথী হতে পারবে কিনা। জীবন তো কারো জন্যই ফুল শয্যা না; আর দাম্পত্য জীবন তো আরো কঠিন….সেই কঠিন সময় গুলো পার করবার জন্য যথেষ্ট ত্যাগ আর পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়। আর সেই ত্যাগের জায়গা গুলো একেক জীবনে একেক রকম হয়, আলোচনার যথেষ্ট প্রয়োজন আছে, যে ছেলে আর যে মেয়েটার বিয়ে হচ্ছে, দুটি পরিবারে বেড়ে ওঠা, দুটি গাছের শেকড় তখন অনেক বিস্তৃত, সেই দুটো গাছকেই কি উপড়ে নিয়ে নতুন মাটিতে বোনা হবে নাকি একটাকে উপড়ে এনে অন্যটার সাথে জোড়া দেয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে অনেকটাই, ঠিক কোন কোন জায়গায় কার কতটুকু ত্যাগ, কতটুকু পরিশ্রম প্রয়োজন, বিয়ে নামক বিধির মাধ্যমে একটা নতুন সম্পর্ক, নতুন গাছ বেড়ে ওঠার সম্ভাবনা। হয়তো ভাবছেন, এ আর এমনকি! পরিবার সম্পর্কে তো খোঁজ নেয়া হয়, পাড়া প্রতিবেশী সবার থেকেই মানে যতটুকু সম্ভব। তা ঠিক আছে। কিন্তু কেউ আমরা জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা তুমি কেন বিয়ে করতে চাইছো? এই বিয়ে নামক সম্পর্ক থেকে তোমার প্রত্যাশা কি? যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছো, তুমি কি জানো, দাম্পত্য জীবন মানে তার কাছে কি? বলবেন, \”কই আগে তো এত আলোচনার দরকার হতো না, সংসার তো টিকে গেছে দিব্যি\”! আমি তবে বিনয়ের সাথে বলবো, সংসার টিকিয়ে রাখাই যদি মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে আমার বলবার কিছু নেই। তবে, বিয়ের লক্ষ্য যদি হয়, জীবনসঙ্গী কে নিয়ে একটা সুন্দর সুস্থ সংসার, যেখানে স্বামী স্ত্রী দুজনাই দুজনাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, যেখানে মানব শিশু জন্ম নিয়ে একজন \”মানুষ\” হিসেবে বেড়ে ওঠে, তেমন দাম্পত্যজীবন সারা উপমহাদেশে গুনে পাওয়া যাবে হাতে গোনা। আর সমীক্ষা যদি করি বেরিয়ে আসবে সেই একি চিত্র। পারিবারিক সম্মতিতেই বিয়ে হোক আর প্রেমের, বিয়ে অনুষ্ঠানাদি শেষ হবার পর ধীরে ধীরে বাস্তবতা যখন গ্রাস করা শুরু করে হোঁচট খায় দুজনাই।

তবে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিয়মানুযায়ী মেয়েরা হোঁচট খেয়েছে বা খাচ্ছে তুলনামূলক ভাবে অনেকবেশী তা বলার নিশ্চয়ই অপেক্ষা রাখে না। মেয়ে যত শিক্ষিতই হোক না কেন, তার পেশা যেন বিনা বাক্য ব্যয়ে অবশ্য ধর্তব্য কিংবা প্রথম বিকিয়ে দেয়া জিনিষ। সে পেশা ডাক্তার কিংবা শিক্ষকতার মত পেশা যা কিনা সমাজে মেয়েদের জন্য \”যথাযোগ্য\” বলে বিবেচিত, সেই ক্ষেত্রেও। ধরেই নেয়া হয়, মেয়েটি পেশা চালিয়ে যেতে পারবে ততক্ষনই যতক্ষন তার স্বামীর পেশায় বিঘ্ন না ঘটায়। এখন কথা হলো, চাকরি করবে কি করবে না, এটা তো যার যার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। চাকরির সাথে দাম্পত্যজীবনের আরো অনেক মূল বিষয় আছে যা নিয়ে ওই সংসার শুরু করতে যাওয়া দুটি মানুষের বিবেচনায় আসা উচিত। যেমন রক্তের গ্রুপ ।

এই রক্তের গ্রুপ মিল অমিল নিয়ে চিকিৎসকরা এত বার সজাগ করার চেষ্টা করছেন, তাও আমরা কেমন নির্বিকার। অশিক্ষিত মানুষের মত একটা বারের মত জানার চেষ্টা করি না, ছেলে মেয়ের রক্তের গ্রুপ সম্পর্কিত তথ্যাদি। এ জানতে চাওয়া যেন বিশাল পাপ ।

তারপর, আরেকটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হলো, জীবন দর্শন। খুব ভারী শোনালেও একটু সমীক্ষা নিলেই দেখতে পাবেন দাম্পত্যকলহের একটা অন্যতম কারণ হলো দুজনার জীবন দর্শনে প্রচন্ড অমিল। কিছু অমিল মেনে নেয়া সহজ, আবার কিছু অমিল গড়াচ্ছে বিবাহ-বিচ্ছেদে কিংবা অসুখী, অসুস্থ দাম্পত্যজীবনে। হয়তো একজন খুব সাধারণ জীবন যাপনে বিশ্বাসী, আর অন্যজন বিলাসিতায়। একজন প্রচন্ড রকম কর্মমুখী আরেকজন জীবন সংগীর সময়ের অপেক্ষায় থেকে থেকে সংসার বিমুখ। একজন সংসারী আরেকজন বিবাগী; একজন স্বাভাবিকের থেকে কিছুটা বেশী রকম সামাজিকতায় বিশ্বাসী অন্যজন ছুটির দিনে কেবলি ঘরে থাকতে চাওয়া মানুষ;

একজন ভাবেন ছেলে মেয়ে লেখা পড়া সব থাকবে বাবা মায়ের হাতে অন্যজন ভাবে এত লেখা পড়া করে কি হবে, তার চেয়ে থাকুক না সন্তানরা খেয়াল খুশি মত। এই রকম হাজারো বিষয় আছে, যা আপনি বলবেন খুব সাধারণ আমি বলবো এই সমস্ত বিষয় আলোচনা না করে না নেয়াই যুগ যুগ ধরে হয়েছে অসুখী দাম্পত্য জীবনের অন্যতম কারণ। কি আশ্চর্য, সংসারের মত এত জটিল একটা বিষয়ে যেখানে প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত গ্রহনের বিষয় থাকে, আর সে সিদ্ধান্তের সাথে থাকে দায়িত্ব গ্রহনের ভার কিংবা জড়িত থাকে অনেকে সেখানে সিধান্ত নেয়া তো একচেটিয়া হবার কথা না, দুজনা মিলেই তো নেয়ার কথা। কেউ সিদ্ধান্ত গ্রহনে অংশগ্রহণ না করতে চাইলে ভিন্ন কথা, কিন্তু সিদ্ধান্ত যে দুজনা মিলেই নিতে হয় সেই মতবাদে বিশ্বাসী তো হতে হবে। অসুখী দাম্পত্য জীবনের ফলাফল জানেন নিশ্চয়ই। তাও বলছি। আমি ভেবে পাই না, যে কোনো মহিলা মহলে গল্প করতে বসলেই আপনি শুনবেন, এক দুই তিন, চার এর পরই শুরু হয় তাদের স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ি নিয়ে অসুখী মন্তব্য, বিষাদময় উপাখ্যান, পুরুষমহলে স্ত্রী দের নিয়ে কটুক্তি যা কিনা খুব সহজ ভাষায় কৌতুকে রুপ নেয়। ভালোই যদি বাসি তাহলে কেমন করে সম্ভব একজন আরেকজনের নামে এই সব বলা, কিংবা কাজ শেষে জীবনসঙ্গীর কাছে ফিরে যাবার তাড়না না থাকা। আর ভালোবাসাই যদি না থাকে সুস্থ সংসার জীবন হবেটা কোথা থেকে বলি! একটা অসুখী দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিনতি কি জানেন? একটা অপূর্নাংগভাবে বেড়ে ওঠা সন্তান। যে বড় হয় বাবা মা একে অপরকে অশ্রদ্ধা করতে দেখে, অথবা বাবার ডমিনেশনে মায়ের আর্তনাদ দেখে, অথবা সংসার মানেই বিভীষিকা জেনে….তাই সে যখন ঘরের গন্ডি থেকে বের হয় সে সমাজকেও দেখে তার অভিজ্ঞতার আলোকে। একটা অসুখী পরিবারের প্রভাব সন্তানের ওপর এর চেয়ে অনেক ব্যাপক, তা নিয়ে নাহয় আরেকদিন বলবো, এখন বরং একটু ফেরত যাই সেই মূল কথায়। বিবাহ পূর্বক আলোচনায়। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ছেলে মেয়েগুলোকে বলা খুব প্রয়োজন দাম্পত্য জীবন মানে কি, এতে দায়িত্ব দুজনারই থাকে। কে কোন দায়িত্ব ভার নেবে সেটা ব্যাক্তিগত ভাবে আলোচনার বিষয়; কারো স্বপ্ন আছে কিনা, সেখানে তার ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর স্বপ্নের সাথে বাধা হয় কিনা, যদি বাধা দেখা যায়, তাহলে বিয়ের আগেই আলোচনা করে নেয়া কিভাবে কৌশলী হয়ে এগোনো যায় ।

আলোচনা করা প্রয়োজন দাম্পত্য জীবন চারা গাছের মত, সেটার যত্ন আত্তির প্রয়োজন, সেই যত্ন আত্তির ভাষা দুজনারই জানা চাই যেন একে অপরকে বুঝে নিতে ভবিষ্যতে কোন অনিশ্চয়তা দেখা না দেয়। দুজনারই দুটি পরিবার আছে, এবং প্রত্যেকে যার যার নিজের পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল। সুতরাং কাজ, সংসার আর নিত্যদিনের ঝামেলার পর কিভাবে দুজনই যার যার পরিবারের পাশে দাড়াতে পারে, একে অন্যের হয়ে নতুন পরিবারের পাশে একজন মেয়ের জামাই না বরং ছেলের মত দাড়াতে পারে, আর ছেলের বউ না বরং মেয়ের মত দাড়াতে পারে সেই সব আলোচনা কি আগেই করে নেয়া ভালো না। তাতে সংসার শুরুতেই ওই রুটিনের মত আমি জেনে গেলাম আমার জীবন সংগী আদতে কেমন, সে কিসে খুশি হয় কিসে বিরক্ত, কিসে সে অপমান বোধ করে, তার স্বপ্ন কি….আর এ সব কিছুতে আমার দায়িত্ব কি! ভাবছেন কি লাভ? সব হারিয়ে যাবে? আমি বলবো, আমি এমন সন্তান তৈরি করবোই কেন যে দাম্পত্য জীবন মানে কি না জেনেই মহা সমুদ্রে ঝাপ দেবে! কর্মজীবনে আমি যদি আমার সন্তানকে দায়িত্ববান হবার মূল্যবোধ দিয়ে তৈরি করতে পারি, দাম্পত্য জীবনে কেন নয়? ওই টাই তো আসল! ছেলে মেয়ের সুখী সংসার হোক কে না চায়! শুধু একটু কৌশলী হলে, হয়তো বা সেই বহু যুগ ধরে চোখের জলে ভিজে উঠতোনা লক্ষ কোটি নারীদের বালিশের ভাঁজ, কিংবা সারাদিন কাজের পরেও, সংসারে ফিরে বহু পুরুষেরা প্রয়োজন বোধ করতো না, জীবনসঙ্গিনীকে মনে করিয়ে দিতে তার সামর্থ্যের দূরত্ব……কিংবা শুনতে হতো না অভিযোগের পাহাড় ।